হারিয়ে যাওয়া "কলিকাতা"
বিকেল হলে পাড়ার মোড়ে লাটাই হাতে বেরিয়ে পড়া, হাফ প্যান্টের সেই ছেলেটা এখন আর ঘুড়ি ওড়ায়না। খবরের কাগজ টা হাতে তুলে নিয়ে চশমার ভেতর দিয়ে ভ্রুকুটি কুঁচকে সেই জ্যেঠুদের দল আর দেখা যায়না। হারিয়ে গেছে সেই স্কুলের ভেতর বোতল দিয়ে ফুটবল খেলার দিন, হারিয়ে গেছে একটা বই দেখে এক ঝাঁক বন্ধুদের বই পড়ার দিন। মায়েরা আর সিনিয়র গার্জেন এর থেকে নতুন ক্লাসের পুরনো বইয়ের আশায় থাকেনা। ডায়েরির ভাঁজে নিজের চেপে থাকা একরাশ কান্না এখন ফেসবুকে সমবেদনার ইমোজি খোঁজে। কিশলয়, সহজপাঠ এর নতুন বইয়ের গন্ধ আর উত্তেজিত করে তোলেনা ছোটদের, তাদের উত্তেজনা হাতের মুঠোয় 5 ইঞ্চিতে বন্দি। সাইকেলে বসে প্রনয়ালাপ, জুড়ি-গাড়িতে বসে বাতাস সেবন এখন "পালসারের" মোটা টায়ারের ওপর হেলানো সিটে প্রেমিকার স্তনের স্পর্শ খোঁজে। বন্ধুত্বে ঝগড়াঝাটি এখন মারপিট করে শেষ হয়না, ফেসবুকের ব্লক লিস্টে, ভারতীয় বিচারব্যবস্থার শ্লথ-গতির মত ঝুলেই থাকে। বাজারে গিয়ে কেউ আর পাটের থলে এগিয়ে দেয়না, পলিথিন ভরা এঁটো-খাদ্য জানলা থেকে ছুড়ে আসে রাস্তায়-রাস্তায়। গ্যাসলাইটের হলুদ আভা এখন আর খুব একটা চোখে পড়েনা, সাদায় ঢেকে গেছে আলোকিত প্রাসাদমন্ডলী। অলিগলি জুড়ে সেই আতর, বেল ফুলের গন্ধ এখন ডিওডোরেন্ট এ উগ্রতা খোঁজে। দাদু-ঠাকুমার থেকে রামায়ন, মহাভারত, গোপাল ভাঁড়ের গল্প এখন আর নাতি-নাতনীরা শোনেনা। টম-জেরীর কার্টুন, টিনটিন, নন্টে-ফন্টের কমিকস ছুঁড়ে ফেলে সংযমহীন ভাবে মোবাইলের গেমে তারা ব্যস্ত, তারা জানেনা কাঁদা মেখে ফিরে আসার ক্লান্ত আনন্দের অভিজ্ঞতা। ফটোর আলব্যম, ডায়েরীর তারিখের বদলে ইনস্টাগ্রাম জুড়ে প্রতিদিনের "ভাইবস" নষ্ট হয়ে যায় ইনস্টাগ্রাম এর কোটির ভিড়ে। পুরুষ-নারীর সম্পর্ক গুলো দু মিনিটের নুডলস তৈরির মত, হালকা আঁচে সেদ্ধ হওয়ার অন্তহীন অপেক্ষা করতে এখন তারা নারাজ। "অপেক্ষা করা", "ধৈর্য্য" ইত্যাদি শব্দ গুলো হেরে যাওয়ার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। বন্ধুত্ব থেকেই সম্পর্ক না করে মানুষ অন্য ভিটেতে আশ্রয়ের খোঁজ করছে, তারপর ব্যর্থ হয়ে সেই বন্ধত্বের কাছেই নতজানু করছে, দৃষ্টি পেয়েছে, দূরদৃষ্টি পায়নি। মৌমাছি মধু হরণ আর করেনা, এখন অন্য ম-ম যুদ্ধ হয়। ক্যাসেট এ কামনালিপ্ত ভিডিও দেখে বড় হওয়া চৌকিদার এখন আর ওসব দেখেন না, তাই সবার দেখা বন্ধ দিয়েছেন। ফুটপাথে থাকা মানুষ গুলি বেলুনের সঠিক ব্যবহার না জানায় দেশের "দশের" সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে, সাথে সেইসব মানুষদের ছবি তুলে কত বিরাট চিত্রশিল্পী মানুষের ইমোজি ভালোবাসা কুড়োচ্ছেন সাথে লোক-দেখানো সমবেদনা। মন্দিরে দাঁড়িয়ে খিচুড়ি ভোগ খাওয়ার সংখ্যা এখন হাতে গোনা যায়, বেড়েছে হৃদয় জুড়ে মিথ্যে আভিজাত্যের অহং-বোধ। বাংলা ভাষা বলতে, ধুতি পড়তে মানুষের বিবেকে আটকায়, অথচ সাহেবদের শেখানো বুলি বলিষ্ঠ করে তারা বাংলা ভাষা কে কদর্যের চোখে দেখে।
তবে সব কিছু পাল্টায়নি, এখনো কিছু মানুষ জরাজীর্ণ আবেগে ই মাথা নত করে থাকে, চুন-সুরকি খসে যাওয়া কঙ্কালসার বাড়ির কাঠামো এখনও আছে। পুলিশ এখনো ভুড়িওয়ালাই আছে। ভোর 4টে থেকে ভোর 5টা কলকাতার সব আলো এখনো নিভিয়ে দেওয়া হয়, তিলোত্তমা হয়ে ওঠে অন্ধকারপুরী। শীতের ভোরে এখনো মানুষ তার লাঠি, নয়তো স্ত্রীর হাত ধরে ভিক্টরিয়ার ফুটপাথে জগিং করে। এখনো কিছু বট গাছ, নারকেল গাছ, ছাতিম ফুল কলকাতার বুকে গন্ধ বয়ে আনে, শরতের তুলোমেঘের সাথে মানুষ আজও মহালয়া শোনে রেডিওতে। হাওড়া ব্রিজ এখনো কাঁপে, ট্রাম-মেট্রো ও এখন ও কলকাতাকে কাঁপিয়ে দিয়ে চলে যায়। ট্রেনের, শৌচালয়ের দেওয়ালে এখনো মানুষ পানের পিক ফেলে। গঙ্গার ঘাট আজও সময় কাটানোর সেরা ঠিকানা। সোনাগাছি এখনো ভিড় হয়, গ্রাম থেকেও শহরে অনেকে আসে শুধু এই মধুপুরীর মধু খেতে। আজও পুরুষ বড় নাকি মহিলা সেই নিয়ে তর্ক চলে, শুধু তর্কেরস্থান বদলেছে। আজও মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নিয়ে কলকাতা দু ভাগ হয়ে যায়। আজও কিছু মানুষ নিজের স্ব-চিন্তাভাবনা কে প্রকাশ করে, আর নির্বোধের কাছে আঁতেল-মার্ক পেয়ে নিজের দাঁড়িতে হাত বোলায়। আর হ্যাঁ, এখনো মৌমাছির চাকে ঢিল মারলে মৌমাছি হুল ফোটায়।
Comments
Post a Comment