পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ কে?

পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ কে? এই প্রশ্নটা মাথায় আসতেই আপনি হয়তো গুগলে জানতে চাইবেন কিন্তু পাবেন না। ইন্টারনেট দুনিয়ায় আপনি হয়তো যে কোনো বিষয়ের উত্তর পেয়ে যাবেন, এই ধরুন কার কত সম্পত্তি, কার কটা বিয়ে কার কতকিছু ঘটনা মাইলফলক ইত্যাদি। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী এবং দুঃখী মানুষ আপনি ইন্টারনেটে ভার্চুয়াল মাধ্যমে খুঁজে পাবেন না। তখনই আপনার সবচেয়ে সুখী খোঁজার ইচ্ছে বাড়বে। কোনো এক সপ্তাহের শেষে স্কুল কলেজ কোচিং কিংবা অফিস সেরে বাড়ি ফেরার সময় আপনার ওপর মঙ্গল তুষ্ট হবে আর শনির সাথে সেই চুক্তি করে আপনার মনে সুখের খোঁজ দেবার আভাস দেবে। সেই আভাস পেয়ে আপনার খামখেয়ালিপনা বেড়ে যাবে আর বাড়ি ফেরার ইচ্ছে চলে যাবে। মনে হবে তিলোত্তমা কে একটু ঘুড়ে আবিষ্কার করে আসি। হঠাৎ করেই কোনো সুখকর সিনেমার নাম শুনে আপনার ইচ্ছে হবে সিনেমা টা দেখার, ব্যাস আপনিও তিলোত্তমার কোনো অপেক্ষাকৃত দুর্গম জায়গার সিনেমা হলে যাবার তোড়জোড় করবেন। আপনার প্রস্তুতি দেখে আকাশ তার বন্ধু মেঘের সাথে গর্জন করে ঝগড়া করবে। আপনি সেই দিক খেয়াল না করেই অনেক টা বেহুশ ভাবে সিনেমা হলের কাছাকাছি কোনো মোড় এ নামবেন বাস থেকে। ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে দেখবেন আপনার মতোই বহু মানুষ বাড়ি ফেরার জন্য ভিড়তম বাসে ওঠার জন্য প্রস্তুত। অবাক হবেন না কারন বাদুড় ঝোলায় আপনারও অভ্যেস রয়েছে। সিনেমা হলের প্রাঙ্গনে পৌঁছে দেখবেন, অনেক ভাষার সমাগম, কিন্তু আপনার বাংলা ভাষায় সিকিউরিটি গার্ড কে কোনো প্রশ্নের পর অনেক পুরুষ এবং মহিলা আপনার দিকে তাকিয়ে হাসছে। যেন ওরকম সিনেমার প্রাঙ্গনে বাংলা ভাষা পিছিয়ে, ইংলিশ বলতে পারলে তাদের আলাদা গর্ব হয়। আপনিও মনে মনে হাসবেন হয়তো এটা ভেবে যে এতকিছুর পর ও তাদের ও কোনও বাংলা সিনেমা দেখতে আসতে হয়। তিলোত্তমার এক প্রান্তের এই সিনেমা হল টা বেশ ফাঁকা বলে আপনার খেয়াল খুশি মত একটা সিটে বসে নিজেকে এলিয়ে দেবেন। কিন্তু কিছুক্ষন পর জনগণমন শুনে আপনাকে ক্লান্ত শরীর নিয়েই উঠে দাঁড়াতে হবে। দেখবেন কিছুজন আপনাকে দেখে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন একপ্রকার। সিনেমা শুরুর পর আপনি মোহিত হয়ে যাবেন সিনেমার মায়ায়। কারন আপনি সিনেমা প্রেমী। সিনেমার শেষে ঘড়ি আপনাকে সংকেত দেবে পৌনে এগারোটা বাজে। এবার আপনিও কোনোমতে বেড়িয়ে সেই কাছের কোনো বিখ্যাত মোড় অবধি ছুটবেন। ইতিমধ্যে আকাশ আর মেঘের ঝগড়ায় মেঘের মেয়ে বৃষ্টি ভয়ে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে। সুতরাং সেই বৃষ্টির জল গায়ে নিয়েই আপনি ছুটবেন। মোড় এ এসে দেখবেন আপনার জন্যই শেষ তম বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে। আপনিও উঠে যাবেন নিশ্চিন্ত হয়ে। বাড়ি ফেরার অনিচ্ছা কিভাবে ইচ্ছেতে পরিণত হল নিজেও ঠাহর করে উঠতে পারবেন না। বেশ এভাবেই বাসের সিটে বসে আপনি পদার্থ বিদ্যার রিলেটিভিটির সাথে ফিলোজফির এক আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাবেন। সুখ নামক বস্তুটি মনে হবে আপনার নিতান্তই আপেক্ষিক। সবটাই যেন এর ওর সাপেক্ষে। লিও টলস্টয় থেকে সক্রেটিস সবাইকেই আপনার স্মরণে আসবে। বাস আপনার গন্তব্যের কোনো স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই মিলিয়ে যাবে। আপনিও দেরি না করে ট্রেনের স্টেশনে উঠে পড়বেন। ট্রেন টা ছাড়ার পর মুহূর্তেই আপনার সিট ছেড়ে আপনি উঠে পড়বেন, গিয়ে দাঁড়াবেন দরজার পাশে যেখানে বৃষ্টির কান্না মেখে হাওয়ার কণারা আপনাকেও ভিজিয়ে দিয়ে যাবে। পরক্ষনেই মনে পড়বে আপনার ছোট বেলার কথা, বাবা মায়ের মধ্যে ঝামেলা হলে ঝগড়া হলে আপনিও ভয়ে কাঁদতেন। তাই আজ বৃষ্টির জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে রিলেটিভিটিকে সেলাম জানিয়ে বৃষ্টির সাথে রোমান্স করবেন। কিন্তু রোমান্স যে পাবলিক সিনেমার পর্দাতেই কিংবা নীল কাঁচ দিয়ে দেখতে পছন্দ করে, তাই আপনারও রোমান্সের মায়া ও মোহ কাটিয়ে এক বুড়োর কাছে প্রশ্ন শুনবেন, " আগুন হবে দাদা?' নিজের দেশের আরেক সন্তান কে বের করে দিয়ে জ্বলন্ত চিতায় তুলে দেবেন অর্থাৎ দেশলাই কাঠি টা দেবেন এবং জ্বালাবেন। বুড়ো বিড়ি তে এক টান দিয়ে ট্রেনের আইন কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দরজার সামনে আপনার মুখোমুখি বসবে। দেশলাই পকেটে ঢুকিয়ে দেশলাই কাঠিটা কে একটা মানুষ হিসেবে ভাবতে শুরু করবেন। কালো মাথা, আর সেই মাথাই তো চুল্লিতে জ্বলে প্রথম। এই সেই ভাবতে ভাবতে হঠাৎ লক্ষ করবেন বুড়ো আপনার দিকে তাকিয়ে হাসছে, না এই হাসিতে কোনো প্যাচ নেই কোনও তামাশা ও নেই। একটা আশ্চর্য মিল পাবেন খুঁজে। জ্যোতিষীরা যেভাবে আপনার হাতের সরল রেখা দেখে ভবিষ্যৎ গণনা করেন, যার কিছুই মেলেনা, কিন্তু এই বুড়োর ঠোঁটের মাঝে এক বক্র রেখা চলে গেছে, যা গোটা মুখকেই সেই বক্র রেখার অনুকরণ হতে বাধ্য করেছে। বক্র রেখার বৈশিষ্ট্য বাম থেকে ডানে প্রথমে নিন্মগতি এবং পরে উচ্চগতি লাভ করেছে, যা দেখে সহজেই বুঝে যাবেন বুড়ো খুব খুশি। আপনিও বুঝতে পারবেন অধিকাংশ মুহূর্তে যে খুশি সেই তো সুখী। আপনার পাল্টা হাসির জবাবে বুড়োর বক্র রেখা আরো বক্রতর হয়ে গেল। সত্যি আপনিও বুঝবেন আপনিও বিনা কারণেই  খুশি এবং সুখী। তখনই বুঝবেন অকারণে শুধু মন খারাপ হয় না, মন ভালো হয়। বুড়ো পরের স্টেশনে নেমে গেলে আবার আপনি ভাবনাচিন্তার গভীর জগতে প্রবেশ করবেন। বুঝতে পারবেন যে সুখ এবং সবচেয়ে বেশি সুখ সবার মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু সবাই বিশ্বাস করে যে তারা অধিকাংশ সময় ই সুখী নয়। আসলে এটা বিশ্বাসের অভাব, নিজের ওপর বিশ্বাস অভাব। কারন আপনি যেটা, সেটা আপনি নিজেও বুঝতে পারছেন না। বরং সুখে নেই বা খুশি নেই এই ভেবেই মন খারাপ করছেন। ঋণাত্মক বিশ্বাস আপনাদের ওপর এক বাতাবরণ সৃষ্টি করে রেখেছে। তাই হয়ত প্রকৃত সুখ কে সুখী হওয়ার অভিনয় ভাবছেন, ভাবছেন এই সুখের স্থায়িত্ত্ব নেহাত ই কিছু সময়ের। এইসব ভাবতে ভাবতে আপনি বাড়ি পৌঁছে যাবেন। আয়নায় নিজের মুখ দেখতে দেখতে বুড়োটার মুখ মনে করে হাসবেন আর আয়নায় আপনার প্রতিকৃতিও হাসছে বুড়োর মত, সেই দেখে আরো হাসবেন। হয়তো এখন যারা পড়ছে তারাও আয়না কল্পনা করে লেখা পড়ে হাসছে। এইভাবেই ঘুমোতে যাবার আগে বুঝে যাবেন, আমরা প্রত্যেকেই সবচেয়ে সুখী, শুধু বিশ্বাসের অভাবে আমাদের সুখ কে আমরা স্বীকৃতি দিয়ে উঠতে পারিনা। কিন্তু ওই বুড়ো জানে সে খুব খুশি, সবচেয়ে সুখী। কারন আমাদের জীবনের দুটো অবস্থা, অফলাইন আর অনলাইন, নিজেদের নিজেরা খুঁজে পাইনা বলে আমরা অন্যদের দোষ দিই বা অন্য কিছুকে। মনে মনে হয়তো এবার প্রতিজ্ঞা করবেন সুখে থাকার পরামর্শ হিসেবে গান শুনবেন নাচবেন, গল্প করবেন আড্ডা দেবেন, বা কিছু একটা করবেন। সারা সপ্তাহের ক্লান্তিও আপনাকে জড়িয়ে ধরবে আর আপনিও এসব ভাবতে ভাবতে হাসি মুখ নিয়ে ঘুমোবেন।
আসলে সুখ অতীতের স্মৃতির পাতায় যেমন থাকে, কল্পনাময় ভবিষ্যতে যেমন থাকে, তেমনি থাকে বর্তমানে, নইলে আপনি সুখী হবার আশাও করতেন না বা অতীত কেও ভুলে যেতেন পুরো।
লেখাটা পড়ে যদি কারুর মন খারাপ ভালো হয়ে যায় বা হাসি পায় , বা একটুর জন্য খুশি হন বা বিশ্বাস আসে নিজের ওপর, তাহলেই লেখার সার্থকতা পাবো।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

Edison vs Tesla

ভ্রমর প্রেম