অভিশপ্ত ট্রেন

সাধারণত আমি সবসময় বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন স্বাদের মানুষের সাথে কথা বলেছি। আমি মানুষের মনের গবেষণা করে থাকি সাধারণত। আমার সম্পর্কে এবার একটু বলি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিদ‍্যা বিষয়ের ছাত্র আমি। আবার IGNOU বিশ্ববিদ্যালয়ের মনঃস্তত্ব বিষয়ে ও ছাত্র। এই পদার্থ আর অপদার্থের খেলায় আমি ছোট থেকেই মত্ত। তবে বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি যেমন পদার্থ বিদ‍্যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ তেমনি মনের সৃষ্টি মনঃস্তত্ব বিদ‍্যার অন‍্যতম অংশ যা এখনো অনাবিস্কৃত। আমি ব‍্যাক্তিগতভাবে ভগবান ভূত এ বিশ্বাস করিনা তেমনি এটাও সন্দেহ হয়, মনের অস্তিত্ব পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা আবিষ্কার হয়না তাই বলে কি মন নেই। এই প্রশ্নের খোঁজে অনেক অলৌকিক মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। তবে সেক্ষেত্রে দেখেছি co-incident, বুজরুকি অথবা জাদু বিদ‍্যা (সন্মোহন) পরীক্ষার ফল। তবে শেষ দুদিনের অভিজ্ঞতা কোনো দিন হয়নি। এই ঘটনার পর প্রোফেসর শঙ্কু ভাবতে ইচ্ছা হয় নিজেকে যদিও তার মত কিছুই আমি আবিষ্কার করিনি।
এবার আসল বিষয়ে ফেরা যাক। গত ২৮শে জুন রাতে এক বিস্ময় কর সাধুর নাম শুনলাম। উনি নাকি পরলোকে যান, ত্রিকালোজ্ঞ বটে। তাই অদম‍্য ইচ্ছা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম তারপর দিন সকালে। জায়গার নাম গলসি। বর্ধমান এর পরে।  ওখানে পৌছতে বেলা ১টা বাজলো। তারপর একে ওকে জিজ্ঞেস করে পৌঁছে গেলাম সেই সাধুবাবার কাছে। তবে ওনার জায়গায় উনি একমনে ধ‍্যান করছেন। দুটি মহিলা ওনার সামনে ছিল, আমায় বারণ করল বাবাকে ডাকতে। খবর পেলাম উনি রাতে জাগেন। তাই চারিদিকে ঘুরতে ঘুরতে বাকি সময় কাটিয়ে রাতে ফিরে এলাম।
রাতে ফিরতেই দেখি জনাকয়েক মানুষ ওনার সামনে বসে আছে। সামনে হোমের আগুন জ্বলছে। সাধুবাবার কপালে লাল সিদুরের তিলক কাটা। চোখের মনির উজ্জ্বল ধূসর রং যে মানুষ গুলি কে সন্মোহিত করার চেষ্টায় আছে তা বুঝতে বেশী সময় লাগল না। অন্ধকার জঙ্গলে তখন কোথা থেকে শিয়াল এর ডাক নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করছে মাঝে মধ্যে। সাধুটি কি  যেন বিড়বিড় করে আওড়াচ্ছে। এতক্ষণ আমি দূরে দাড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলাম। হঠাৎ সাধুটি আমার নাম নিয়ে জোরে এবং গম্ভীর ভাবে ডাকলেন এবং কাছে আসতে বললেন। প্রচন্ড অবাক হলাম নাম জানল কীভাবে আর আমাকে দেখতেই বা পেলো কিভাবে? কাছে যেতে বুঝলাম মানুষ গুলি এখন পুরোপুরি সন্মোহিত। মনে মনে বললাম সাধু যে জাদরেল তা বোঝাই যাচ্ছে। অতঃপর সাধু নিস্তব্ধ ভঙ্গ করলেন গম্ভীর স্বর দিয়ে। প্রশ্ন করলেন কেন এভাবে এতদূরে এসছি? আমার পর্যবেক্ষণ তখন সাধুর সামনে রাখা কঙ্কালের খুলির দিকে। ইতস্তত হয়ে বললাম, না মানে আপনার নাম শুনলাম তাই দেখতে এলাম। আমার মুখের মৃদু হাসির রেখা দেখে সাধু বললেন, তোমার ভয় করছেনা? উত্তর এ হ‍্যা বললাম যদিও ভয় বিন্দুমাত্র ছিল না। বেশ যাও ওদের মধ্যে গিয়ে বস, বেশ অধিকারের সুরে বললেন সাধু।  অগত‍্যা বসলাম সেই পুতুল দের মাঝে। এবার আমার উদ্দেশ্য সাধুর সন্মোহন বিদ‍্যার নমুনা দেখতে পেলাম। তবে আমাকে সন্মোহিত করা সহজ নয়। প্রোফেসনাল Hypnotist ব‍্যর্থ হয়েছে আমাকে hypnotised করতে গিয়ে। শুধু দেখতে দেখলাম চুপ করে কি কি হয়। এবার সাধু এক এক করে মানুষ গুলো কে আসতে বললেন। ওনারা গিয়ে সাধুর কাছে মৃত আত্মীয় এর নাম বলতে লাগলেন, আর সাধুও বেশ অভিনয় করে আত্মা নামিয়ে তাদের সাথে কথা বলিয়ে দিলেন। মনে মনে সাধুর অভিনয়ের তারিফ না করে পারলাম না। এসব দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝিনি। কিছুক্ষণ পর ঘুম ভাঙ্গল। দেখলাম কোথাও কিছু নেই, কেউ নেই, শুধু আগুন জ্বলছে। উঠে পড়লাম। ভালো করে চারিদিকে দেখলাম কেউ নেই, কিন্তু পর মুহুর্তে এক দৃশ্য দেখে প্রতি শিরা উপশিরায় শিহরন খেলে গেলো। দেখলাম যেখানে এতক্ষণ বসে ছিলাম, সেখানেই বসে আছি, কিন্তু আমি তো দাড়িয়ে। একটু ও অপেক্ষা না করে তাকে ছুতে গেলাম, কিন্তু পারলাম না। তাকে দেখা যাচ্ছে অথচ সে হাওয়া। অবিশ্বাস্য রকম ভাবে হঠাৎ আমার প্রতিবিম্ব আমার দিকে তাকালো, আমি পুরো কপি, তবে তার মুখ ফ‍্যাকাসে। সে বলল বাচতে চাইলে পালাও। আশ্চর্য, এক ই গলার স্বর। চিমটি কাটলাম, দেখলাম স্বপ্ন নয়, বাস্তব। কয়েক সেকেন্ড পরে দেখলাম মশাল  হাতে কারা যেন আসছে। ছায়া বলল, এক্ষুনি পালাও, নাহলে আমার মত তোমাকেও মেরে ফেলবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কে? সে মৃদু হাসল। তারপর দেখি মশাল ধারী লোকগুলো কাছে চলে এসে ঘিরে ফেলেছে। এক পা এক পা করে এগোচ্ছে আমার দিকে। ওরা কি আমায় আগুনে পুড়িয়ে মারবে? তারা কাছে এসে হঠাৎ আমার মধ্যে দিয়ে গিয়ে(যেন আমি তাদের কাছে হাওয়া) ছায়া র গায়ে আগুন ঢেলে দিলো। আমি প্রানপনে ছুটলাম। কয়েকটি মাঠ পেরিয়ে দেখলাম স্টেশন। তখন রাত ২টো। ২টো ৫এ একটা ট্রেন এলো। চট করে উঠে পড়লাম। জানলার ধারে বসলাম। যাত্রী রা এই মাঝরাতেও জেগে দেখে অবাক হলাম। তবে জেনারেল কামরায় সব ই সম্ভব।
সময় নষ্ট না করে ট্রেন ছেড়ে দিল। একটু পরে দেখলাম, সামনে সেতু। আসার সময় দেখেছিলাম। আগে কাঠের সেতু ছিল, ওটা ভেঙে যাওয়ার পর লোহার সেতু চালু হয়। কিন্তু একি! ট্রেন টা লোহার সেতুর দিকে না গিয়ে, বাদিকে ভাঙা কাঠের সেতুর দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এই সেতু দিয়ে ট্রেন চলা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ লক্ষ‍্য করলাম, চারিদিকে মানুষ গুলো কে কোথায় যেন দেখেছি। বিদ্যুৎ এর বেগে মনে পড়ে গেল এরা সেই মানুষ গুলো যারা সাধুর কাছে পুতুল হয়ে গেছিল। ওনারা এখানে কীভাবে এল সেটা ভাবতে ভাবতেই দেখলাম ট্রেন প্রায় সেতুর সামনে এসে গেছে। বিপদে পড়লে কোনো দিন বিচলিত হইনা, এবারেও ব‍্যতিক্রম হলনা। ছোট বেলায় শুনেছিলাম এই সেতু ভেঙে একটি ট্রেন রাতে নদীর জলে পড়েছিল। অলৌকিক কে মেনে দরজার সামনে এলাম। সেতু তে ট্রেন ঢোকার আগেই মারলাম ঝাপ।
চোখ খুলে দেখলাম আমি একটা মাটির ঘরে শুয়ে । হাতের ঘড়ি তে দেখলাম দুপুর ১টা। শরীর তখন পুরো ক্লান্ত। ঘরে কেউ নেই। তাই আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন ঘুম ভাঙল, সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। আকাশ কালো মেঘে ভর্তি। দরজা খুলতে গিয়ে দেখি সেটা বাইরে থেকে বন্ধ। জানলা টা পাতলা কাঠের , তাই ভাঙতে কোনো অসুবিধা হলনা। জানলা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মাঠে।
আরেকটু যেতেই চোখ পড়ল সেই সাধুর। সাধু তখন ধ‍্যানে মগ্ন। তবে আজ সে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। হঠাৎ তার সামনে বসে থাকা এক ভক্ত কে কী যেন বললেন। তার পর দেখি সেই ভক্ত আরো দুজন ষন্ডা গোছের লোক নিয়ে সেই কুড়েঘরটির দিকে এগোচ্ছে। কিছুক্ষন পর তারা এসে সাধুকে জানালো যে তাদের শিকার পালিয়েছে। আমি আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সাধুর সামনে গেলাম। আমার বাম হাতে মুঠো করে স্কোপোলামাইন এর গুড়ো ছিল। হঠাৎ করে ওদের সামনে গিয়ে সেই গুড়ো ওদের মুখে ছুড়ে দিলাম। যারা জানেনা তাদের বলে রাখি এই স্কোপোলামাইন ৫ সেকেন্ড এর মধ্যে কাউকে মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধ (paralyzed) করে দিতে পারে। মুহূর্তে ওরা ধরাশায়ী হল। ওদের ভালো করে দড়ি দিয়ে বেধে, পুলিশ ডাকতে গেলাম। পুলিশ এসে একটি মাটির নীচের ঘর খুজে পেল, সেখানে কয়েকটি নর কঙ্কাল। বোঝাই গেল, এ সাধু মানুষ খুনি। সেই রাতে কোলকাতা আসার শেষ ট্রেন ধরলাম।
তার পর দিন। এখন রাত দুটো। উইকিপেডিয়ায় খুজে পেলাম এক চাঙ্চল‍্যকর বিষয়। সেই রাতের ট্রেন টি আসলে প্রায় ১৫বছর আগের ট্রেন। ট্রেন টি সেই কাঠের সেতু ভেঙে পড়ে যায় নদীর জলে। স্থানীয় লোকের দাবি, আজও ওই একই সময় ট্রেনটি আসে আর ওইভাবে কাঠের সেতু দিয়ে গিয়ে নদীর জলে পড়ে। ওই ট্রেনেই একজন সাধু ছিলেন, উনি ট্রেনেই একভাবে ধ‍্যান করছিলেন,‌ হঠাৎ একজন ওনাকে বিরক্ত করায় উনি গোটা ট্রেন কে শাপ দেন। বলা হয় সাধুর অভিশাপ এই ট্রেন এর এই অবস্থা। সেই সাধু নাকি মৃত মানুষ বাচিয়ে তোলার খবর জানতেন। তাই গ্রামের লোক মারা গেলে ওনার কাছে নিয়ে আসা হত। ল‍্যাপটপ বন্ধ করে ভাবলাম, এ কথা পুলিশ মানবে কেন। তার পর বিছনায় সুতেই সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আমি অবাক। সেই সাধু। ঠিক বাদুর ঝোলার মত সিলিং থেকে ঝুলছে।
            ×------------সমাপ্ত------------×

Comments

Popular posts from this blog

পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ কে?

Edison vs Tesla

ভ্রমর প্রেম