প্রিয় টুকু
___প্রিয় টুকু___
"তব আঁখি দুয়ারে দাঁড়াল ক্ষুদ্রতম সিন্ধু, আমি কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে ঝাঁপ দিলাম সেথায়, রুক্ষ বালুকা আমায় গ্রহণ করলোনা, ফিরিয়ে দিল পূবের কোনো এক গঙ্গায়, যেথায় ভগীরথ তার মৃত প্রসূতির ভ্রূণ যমুনাকে তন্ন তন্ন হয়ে খুঁজছে।"
উপন্যাস এর বইগুলো ক্রমশ আবছা হচ্ছে বাস্তবের ধুলোয়। থাকে থাকে সাজানো গ্রিফিথস, ফেইনমান, স্পাইজেল ইত্যাদি ইত্যাদি। ওপরের দিকটায় রবীন্দ্রনাথ এর একবিংশ খন্ড অবধি নজরে আসে, বাকিগুলো হয়তো ইঁদুর প্রজাতিকে শিক্ষা দিতে খরচ হয়েছে। বনেদি বাড়ি হলেও জাকজমক একেবারেই নেই। একবিংশ শতাব্দীতেও হরি ঘোষ স্ট্রিটের বাড়িতে সেকেলে বৈদ্যুতিক বাল্ব। রান্নাঘরে রান্না হয়না বললেই চলে, বরং সেটা এখন পোকামাকড়দের সুরক্ষিত আস্তানা। রক্তিম দত্ত, পেশায় প্রকাশক, তবে ছোট প্রকাশনা, গল্পের বই সাধারণত মুদ্রিত হয়। মহাবিদ্যালয়ে পড়ার সময় পদার্থ বিদ্যায় স্নাতক হতে চেয়েছিলেন কিন্তু দুবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হতে পেরে সব ছেড়ে বাবার ব্যবসায় ঢুকলেন। বন্ধু বলতে একজনই, কল্যাণদা। তিনি যাত্রায় অভিনয় করেন। হয়তো যাত্রায় অভিনয় করেন বলেই অভিনেতা হলেও ওনার অবাস্তবিক দুনিয়ায় সেরকম বিচরণ নেই। ইনিও উত্তর কলকাতার সিমলায় থাকেন। রক্তিম কল্যাণ বন্ধু হলেও বয়সের গাণিতিক ব্যবধান বন্ধুত্বের ভিতর সন্মান এবং শালীনতার রুচি বজায় রেখে চলেছে। রক্তিম বিবাহ করেছিল কিন্তু অপ্রত্যাশিত বিচ্ছেদে রক্তিম তার ছোট মেয়ে কে নিজের কাছে ধরে রাখতে পারেনি। "টুকু কোথায় রে? -এইতো বাবা আসছি" দিনগুলো কখনও ফিরে আসেনি। স্বামী স্ত্রীর বিচ্ছেদে ভুক্তভোগী সন্তান বেশি হয়, টুকুর জীবনেও তাই হয়েছিল, তখন সে অনেক ছোট। কল্যাণদা কে 'জেতু' বলে ডাকার কন্ঠস্বর আজ ১৬ বছর হলো, ফিরে আসেনি। বাঙালি দুঃখ বিলাসী, তাই হাজার আনন্দের মাঝেও ওই সাদা কালো স্মৃতিগুলোই বারবার ফিরে আসে। টুকুর আজ জন্মদিন, ২১তম। কলেজের বন্ধু থেকে শুরু করে মাতৃ স্থানীয় আত্মীয় সবাই মিলে হইচই করে উদযাপন করছে। টুকু আজ টুকু নামে পরিচিত নয়, সে রূপমিতা ভট্টাচার্য এমনকি ফেসবুক নামক এক অবাস্তবিক দুনিয়ায় তার ডাকনাম 'রুপা' প্রদত্ত যা তার জননী কর্তৃক সদত্ত। জনকের কোনরূপ চিহ্নই মেয়ের মধ্যে রাখতে চাননি রানুবালা ভট্টাচার্য। রুপা তার বাবার কথা মনে করতে চায় কিন্তু মুখ মনে পড়েনা, মা বলে "বাবার কথা ভাবতে হবেনা তোমাকে, মন দিয়ে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াও"।
সেদিন রাতে কল্যাণ দার সাথে প্রযুক্তির অগ্রগতি নিয়ে বিস্তর আলোচনার পরে যখন রক্তিম বিশ্লেষণ করে এই নবীন সমাজ ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে এবং তার এক এবং অদ্বিতীয় কারন মোবাইল ফোন অথবা চলভাষ ঠিক তখনই রক্তিমের মাথায় আলোর থেকেও দ্রুত গতিতে স্মৃতিদের কণাগুলো ছুটে আসে আর তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে যায় তার টুকুর কথা, আজ তার জন্মদিন কিন্তু যোগাযোগ এর মাধ্যম নেই। আবার তার টুকু নবীন যুগের তরুলতা, তাই তার ফেসবুক নামক জগৎ টি থাকতে পারে এই আশায় রক্তিম দত্ত সেই জগতে প্রবেশ করার আগ্রহ জানালেন এবং তৎক্ষণাৎ নতুন একটি ফোন কিনে তা থেকে নিজের একটি কোষাগার খুললেন। পড়তে জানলেও প্রযুক্তি তে পিছিয়ে থাকা রক্তিমের কাছে ভরসা সেই কল্যাণদা। শুরু হয় অন্বেষণ এর পালা। 'রূপা দত্ত' নাম দিয়ে খোঁজা শুরু। কিন্তু সে নাম বদল হয়ে গিয়েছে তাই খুঁজে পাওয়া মুশকিল তার উপর টুকুকে এখন কেমন দেখতে হয়েছে তা জানা নেই। অসম্ভব ইচ্ছা সত্বেও অসম্ভব জেনে অসম্ভব ভাবে হাল ছেড়ে দিল দুজনে। তারপর থেকে প্রতি রাতে রক্তিম তার মেয়েকে খোঁজে। রুপা দত্ত নামের মোটামুটি কয়েকজনকে যাদের বয়স টুকুর মত হতে পারে সেই আন্দাজে বন্ধুত্বের রিকোয়েস্ট পাঠায় রক্তিম। তারা কেউই গ্রহন করেনা কারন সে বুড়ো, মেয়েদের মনে এ বুড়োর ভীমরতি ধরেছে। প্রায় মাসখানেক পর কল্যানদা বাড়িতে আসলে ব্যর্থতার কাহিনী বলা হয়। অনেক ভেবে কল্যাণ রক্তিম কে বুদ্ধি দেয়, রক্তিমের স্ত্রী কে খুঁজতে। সেই উপদেশ অনুযায়ী খুঁজতে খুঁজতে রক্তিম পেয়ে যায় তার স্ত্রী কে। সেখান থেকে তার মেয়ের নাম খুঁজতে থাকে পায়না। অনেক ঘাটাঘুটির পর জন্মদিন এর ছবিতে টুকু কে দেখতে পায় রক্তিম, ঠিক ১৬বছর পর। বাবা তার মেয়ের অপেক্ষায় যখন প্রহর গোনে আর শেষ পর্যন্ত উপস্থিতির আনন্দ যে ঠিক কতখানি তা গড়িয়ে পড়া জল দেখে কল্যানদার বুঝতে অসুবিধা হয়না। টুকু কে রিকোয়েস্ট পাঠানো যায়না। তাই বাধ্য হয়ে বার্তা পাঠায় রক্তিম, "চিনতে পারছিস টুকু?" অজস্র বার্তার ভিড়ে চাপা পড়ে যায় বাবার ভার্চুয়াল চিঠিটা। সপ্তাহ পাড় হয়ে গেলেও মেয়ের কোনো উত্তর পায়না বাবা। কল্যাণের শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে মেসেঞ্জার এ কল করতে থাকে রক্তিম। বিরক্ত হয়েই নিজের বাবাকে অজান্তেই ব্লক করে দেয় টুকু ওরফে রুপা। বাড়িতে বসে বন্ধু মা মায়ের বন্ধুদের সাথে বিরিয়ানি আর চিকেন চাপের গন্ধে বাবার কান্নার গন্ধ টা টুকুর নাক অবধি পৌঁছে ওঠেনা অথবা পৌঁছলেও সেই গন্ধ ফ্যাকাসে বলেই কোনোকিছু বোধ করেনা টুকু। ম্যাক্স বর্ণের বইটা খুলে রক্তিম চোখ বুলোয় সেই লাইনটার উপর "Light + Light don't give you always more light, eventually it gives dark in some moments" রক্তিমের রক্তিম চোখ দুটো আজ পিপাসিত তাও তারা ভিজে।
আবার পরের সপ্তাহে কল্যাণ এসে নতুন একাউন্ট খুলে দেয়, আবার নিজের টুকু কে খুঁজে পায় রক্তিম, এবার একটু সন্তর্পণে বার্তা পাঠায়, "আমি জানি তুই আমাকে চিনতে পারছিসনা, কিন্তু একটু মনে করে দেখ আমি তোর বাবা। মনে পড়ছে আমাকে? তোর মা হয়ত আমার কথা তোকে বলেনি কিন্তু আবার একবার শুধষ মা'কে। তোর উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম" আজ রুপা মেসেজ টা পেয়েছে, সে বিস্মিত হয়ে তার মা কে জিগ্যেস করে সত্যতা সম্পর্কে, কিন্তু জননী তার অধিকার বোধ সম্পর্কে বড্ড অবগত তাই ওই অজানার ব্যক্তির কথা মিথ্যে বলে দাবি করে সে তার মেয়েকে বারন করে অজানা লোকেদের সাথে বকতে। নবীন যুগের শালীনতার বাড়বাড়ন্ত ঠেলায় রুপা খানিক ঠাট্টার জন্যই উত্তর দেয় রক্তিম কে, "আর কিছু বলবেন?" উত্তরের অপেক্ষায় বসে থাকা বাবা বার্তার আগমনী ধ্বনি শুনে হৃদয়ের মধ্যেই কিছুটা নৃত্য করে ওঠে এবং বার্তা টা দেখে আনন্দের সহিত আবার বার্তা লিখতে থাকে, "আমি তোকে খুব ভালোবাসি, কখনো ভাবিনি তোকে আবার খুঁজে পাবো, একদিন আমার কাছে আয়, তোর সাথে অনেক কথা গল্প বাকি, আয় মা একদিন" আর পাঁচ জনের সাথে গুলিয়ে রুপা শেষ বার্তা লেখে," আপনি এতদিন ছিলেন কোথায়? আপনার এই ভালোবাসার নমুনা এবার সবাই দেখতে পাবে" ঠাট্টার স্বর ফোনের ওপারে থাকা রক্তিম বুঝতে পারেনা বরং উল্লসিত হয়। পরক্ষনেই দেখে "you can't reply to this conversation more..." হয়তো কোনো গোলমাল হয়েছে, তাই সে কল্যাণ দার আসার অপেক্ষায় বসে থাকে।
কল্যাণ দা এলে তাকে সেটা বললে কল্যাণ দা বলে, " তোর মেয়ে তোকে ব্লক করে দিয়েছে" প্রথমে বিশ্বাস না করে তার মেয়ে কে দেখতে চায় রক্তিম। কল্যাণ তার নিজ এক্যাউন্ট থেকে মেয়ের প্রোফাইল খুলে একটা পোস্ট দেখে খুব অবাক হয়। রুপা তার বাবার সাথে কথার স্ক্রিনশট দিয়েছে, এবং উল্লেখ করেছে," এই বয়সী লোকেদের ছুকছুকানির উদাহরণ নজিরবিহীন" এবং সেখানে কমেন্ট এ যত্র তত্র অশ্লীল শব্দ প্রয়োগের দ্বারা রক্তিম দত্তের নামে সমস্ত ধরনের মামলা রুজু হয়ে গেছে। হাত থেকে ফোন টা কেঁড়ে নিয়ে রক্তিম সমস্ত কিছু দেখতে থাকে আর সব টা শেষে কল্যাণ দা কে ধন্যবাদ এবং নমস্কার দুই জানিয়ে নিজের শোবার ঘরে ঢুকে যায়। ছিটকিনির প্রত্যাশিত এবং অপ্রত্যাশিত শব্দে কল্যাণদা ও উঠে বেরিয়ে যায়।
পরের দিন ভোর বেলা কল্যাণ যাত্রা করতে বেরোবে হঠাৎ দেখে বাড়ির লেটার বক্সে একটা চিঠি। পুরোটা পড়ে নিয়ে এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে রক্তিমের বাড়ির দিকে এগোতে থাকল। ঢুকে দেখল ঘরের দরজা বন্ধ। ধাক্কা মেরে খোলা সম্ভব নয় বলেই পাড়ার লোক কে ডাকলো আর তাঁরা এসে দরজা ভাঙতেই মেঝেতে উল্টোনো চেয়ারটা আর তার ওপরে ভাসমান দুটো পা। একটা ভাসমান দেহ প্রায় স্থির হয়ে ঝুলছে। পুলিশ আসতেও বেশি সময় নিলনা, আত্মহত্যার কারন হিসেবে স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করেছে বলে লিখে গেছে চিরকুটে। ময়নাতদন্তের জন্য দেহ পাঠানো হলো এবং শেষে সৎকার, কাশিমিত্র শ্বসানে।
রুপা আজ কলেজে যাবার পথে একজনের থেকে একটা চিঠি পেল, স্ট্যাপল করা। লোকটি বয়স্ক। বাড়ি ফিরে সে মনোযোগ দিয়ে চিঠি টা দেখার আগে বাকি যুক্ত কাগজ গুলি দেখল, সাথে একটা ছবিও, ছবিটা রুপার মায়ের সাথে ওর বাবার বোধহয়। মা কে না জানিয়েই চিঠিটা পড়া শুরু করলো। সব টা শেষ হবার পরে সে মায়ের কাছে ছুটল, চিঠিটা ধরিয়ে জিগ্যেস করল খুব ধীরে শান্তভাবে, "কেন করলে মা তুমি আমার সাথে এরকম? তুমি আমাকে সব দিয়েছ, কিন্তু কোনোদিন বাবার ছোঁয়া দিতে পারোনি, আর যখন আমি সেটা পাওয়ার সৌভাগ্য পেলাম তুমি আমার থেকে সেটুকুও কেড়ে নিলে?" মায়ের চোখে এখনো জল আসেনি তবে আসতে পারে, রুপা বলে চলল,"তুমি বারবার বলেছ আমার বাবা নেই, সে নাকি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে? সে যদি যাবে তাহলে বাবা কেন বিয়ে করলোনা আবার যেটা তুমি করতে পারলে? আমি যাকে ড্যাড বলে ডাকি সে আমার বাবা নয়, আমার কষ্ট হলে তোমরা আমাকে খাইয়েছ ঘুড়িয়েছো জামা কিনে দিয়েছো কিন্তু দিনের শেষে আমার কষ্ট টা কমেনি শুধু পাশাপাশি আনন্দের মাত্রা টা একটু বেড়েছে। আমি পরীক্ষায় কম নাম্বার পেলে তোমরা আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলে, নিজেরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে গিয়ে আমায় ওই রাস্তায় টেনে নিয়ে গেছো। কেন? উত্তর দাও" শেষের কথা গুলোয় কন্ঠস্বর অনেকটা বেড়ে গেছিল রুপার, সে আর কিছু না বলে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। আটকানোর মতো কেউ নেই। সে কাঁদতে কাঁদতে হাটছে। ভবানীপুর এর রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে কখন হাজরা এসে গিয়েছে সে বুঝতে পারেনি। আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে সে রাস্তাও পাড় হচ্ছে। একটা লরি সেইসময় বাক নিচ্ছিল কিন্তু রাত বলে একটু দ্রুতই নিচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ টুকু সেই লরির সামনে আচমকা এসে পড়লে ব্রেক কষলেও কিছু করার থাকেনা। মস্তিষ্কের প্রায় সবটাই থেতলে যায়, রক্তে ভরে যায় রাস্তাটা। কিছুক্ষনের মধ্যেই পুলিশ ছুটে আসে ট্রাফিক বুথ থেকে। ময়নাতদন্তে দেহ পাঠানো হয়, দেহ চিহ্নিত করা হয় আর টুকুর জিনসের পকেটে সেই চিঠিটা গোঁজা ছিল।
"রূপমিতা,
আমি জানি তোর মা তোকে কোনোদিন তোর বাবার আসল পরিচয় দেয়নি, তাই তুই আমাকে চিনতে পারিসনি। আমি জানি তুই মুখের কথায় বিশ্বাস করবিনা, তাই চিঠিটার সাথে সমস্ত প্রমান এবং বীমা দলিল জুড়ে দিলাম। তোর মায়ের সাথে আমার বিচ্ছেদ হয় ১৬বছর আগে, তুই তখন ৫বছর। তোর সাথে তোর ছোটবেলার সময় কাটাবো ভেবেছিলাম কিন্তু তা হলোনা, তোর মা কে বলিস আমি আজও তোর মা কে খুব ভালোবাসি। সংসার টা খুব প্রিয় ছিল কিন্তু বাকিটা ইতিহাস হয়ে গেল। তোর নামে সমস্ত বীমা আর দলিল করা আছে। ফেসবুকে আমি তোকে মেসেজ করে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছি, অতটা খারাপ তোর বাবা নয়। ভালো থাকিস।
--ইতি--
টুকুর বাবা"
__-------__সমাপ্ত____------__
Comments
Post a Comment